ভারত-জাপান লোকসংগীত: তুলনামূলক বিশ্লেষণ
জাপানি লোকসুর তত্ত্ব
জাপানি লোকসংগীতের সুর-কাঠামো
ভারতীয় সংগীতের রাগ পদ্ধতির মতোই জাপানি লোকসংগীতে সুরের জগৎ মোডাল কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে গঠিত। তবে এর দর্শন ও গঠনশৈলী সম্পূর্ণ ভিন্ন। যেখানে ভারতীয় রাগ স্বরের নির্দিষ্ট আরোহণ-অবরোহণ, বাদী-সমবাদী ও পকড়ের মাধ্যমে একটি বিস্তৃত আবেগঘন পরিবেশ তৈরি করে, সেখানে জাপানি সংগীতে কয়েকটি নির্দিষ্ট স্কেল বা 'চৌশি' (調子) সংগীতের ভিত্তি স্থাপন করে। এর মধ্যে সবচেয়ে প্রভাবশালী হলো ইন ও ইয়ো স্কেল।
ইয়ো স্কেল (Yo Scale): এই স্কেলটি একটি অ্যানহেমাইটোনিক (যেখানে কোনো অর্ধস্বরের ব্যবধান নেই) পেনটাটোনিক কাঠামো, যা অনেকটা আমাদের ভূপালী বা দুর্গার মতো। এর স্বরবিন্যাস সাধারণত ১, ২, ৩, ৫, ৬ (সা, রে, গা, পা, ধা) হয়ে থাকে। এর চরিত্র উজ্জ্বল, উন্মুক্ত এবং আনন্দময়, যা জাপানের গ্রামীণ উৎসব ও লোকগাথায় ব্যবহৃত হয়।
ইন স্কেল (In Scale): এটি জাপানি সংগীতের সবচেয়ে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য বহন করে। এটি একটি হেমাইটোনিক (যেখানে অর্ধস্বরের ব্যবধান থাকে) পেনটাটোনিক স্কেল। এর কাঠামোতে দুটি অর্ধস্বর থাকে, যা প্রায়ই মূল স্বরের ঠিক পরেই এবং পঞ্চম স্বরের পরে দেখা যায় (যেমন: ১, ♭২, ৪, ৫, ♭৬ বা সা, কোমল রে, মা, পা, কোমল ধা)। এই অর্ধস্বরের উপস্থিতির কারণে 'ইন' স্কেল একধরনের বিষণ্ণ, গভীর এবং রহস্যময় অনুভূতি তৈরি করে, যা ভারতীয় সংগীতে কোমল স্বরযুক্ত রাগের মেজাজের সঙ্গে তুলনীয় কিন্তু গঠনগতভাবে ভিন্ন।
মিন'ইয়ো এবং অন্যান্য পেনটাটোনিক স্কেল
ইন এবং ইয়ো ছাড়াও জাপানি লোকসংগীতে আরও অনেক স্কেল প্রচলিত আছে, যার মধ্যে মিন'ইয়ো স্কেল বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এটিও একটি পেনটাটোনিক স্কেল, কিন্তু এর চরিত্র ইন বা ইয়ো থেকে ভিন্ন। এর সাধারণ রূপটি হলো ১, ৩, ৪, ৫, ৭ (সা, গা, মা, পা, নী)। এই স্কেলটি জাপানের কর্মসংগীত, মাছ ধরার গান বা ধান কাটার গানের মতো শ্রমনির্ভর লোকসংগীতে বেশি ব্যবহৃত হয়। এর মধ্যে এক ধরনের দৃঢ় এবং মাটির কাছাকাছি অনুভূতি রয়েছে।
এছাড়াও জাপানের বিভিন্ন অঞ্চলে নিজস্ব স্কেল প্রচলিত আছে। যেমন ওকিনাওয়ার 'রিউকিউ' স্কেলে পঞ্চম স্বর (পা) বর্জিত থাকে (১, ৩, ৪, ৬, ৭ বা সা, গা, মা, ধা, নী), যা একে এক অনন্য সোনোরিটি প্রদান করে। এই বৈচিত্র্য ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের লোকসংগীতের সুরবৈচিত্র্যের কথা মনে করিয়ে দেয়।
ভারতীয় রাগের সাথে তুলনামূলক বিশ্লেষণ
জাপানি স্কেল এবং ভারতীয় রাগের মধ্যে তুলনা করলে কিছু আকর্ষণীয় সাদৃশ্য ও বৈসাদৃশ্য চোখে পড়ে।
কাঠামোগত পার্থক্য: ভারতীয় রাগ আরোহণ-অবরোহণের নির্দিষ্ট নিয়ম, বাদী-সমবাদী স্বরের সম্পর্ক এবং পকড়ের ওপর নির্ভরশীল, যা রাগের চরিত্র নির্ধারণ করে। অন্যদিকে, জাপানি স্কেলগুলো মূলত একটি নির্দিষ্ট স্বরসমষ্টির সেট, যেখানে আরোহণ-অবরোহণের নিয়ম ততটা কঠোর নয়। রাগের মতো 'চলন' বা 'বিস্তার'-এর ধারণা জাপানি সংগীতে অনুপস্থিত।
গুরুত্বপূর্ণ স্বর: রাগের বাদী-সমবাদীর মতোই জাপানি স্কেলেও কিছু স্বরকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়, যা সুরের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে কাজ করে। সাধারণত, মূল স্বর (tonic) এবং পঞ্চম স্বর (dominant) প্রায়ই প্রভাবশালী থাকে। তবে কিছু গানে চতুর্থ স্বরকেও কেন্দ্র করে সুর আবর্তিত হতে দেখা যায়, যা রাগের অংশবিশেষে ন্যাসের মতো কাজ করে।
মাইক্রোটোনাল বৈচিত্র্য: ভারতীয় সংগীতে শ্রুতি বা মাইক্রোটোনের ব্যবহার অত্যন্ত সুসংগঠিত এবং শাস্ত্রীয়ভাবে সংজ্ঞায়িত। জাপানি লোকসংগীতে মাইক্রোটোনের ব্যবহার এতটা সুশৃঙ্খল না হলেও, বিশেষ করে কণ্ঠসংগীতে এবং শ্যাকুহাচি বা শামিসেনের মতো যন্ত্রে স্বরের সামান্য পরিবর্তন বা 'পিচ বেন্ডিং' (pitch bending) লক্ষ্য করা যায়। এই কৌশলটি সুরের মধ্যে গভীর আবেগ সঞ্চার করে, যা অনেকটা ভারতীয় সংগীতে মীড় বা গমকের কাজের মতো।
আবেগের প্রকাশ: ভারতীয় সংগীতে যেমন বিভিন্ন রাগ বিভিন্ন রস বা আবেগ (যেমন করুণ, বীর, শান্ত) প্রকাশ করে, তেমনি জাপানি 'ইন' এবং 'ইয়ো' স্কেল দুটি বিপরীতধর্মী আবেগ প্রকাশের জন্য ব্যবহৃত হয়—'ইন' বিষণ্ণতা এবং 'ইয়ো' আনন্দ। তবে রাগের মতো একটি স্কেলের মধ্যে আবেগের এত সূক্ষ্ম এবং বিস্তৃত প্রকাশ জাপানি লোকসংগীতে বিরল।
মূলত, জাপানি লোকসংগীতের মোডাল কাঠামো ভারতীয় রাগ পদ্ধতির তুলনায় সরল হলেও এর নিজস্ব গভীরতা ও সাংগীতিক তাৎপর্য রয়েছে। উভয় পদ্ধতিই সুরের মাধ্যমে মানুষের গভীরতম অনুভূতি প্রকাশ করে, কিন্তু তাদের পথ ও প্রকাশভঙ্গি ভিন্ন।
জাপানি লোকসংগীতের কোন স্কেলটি তার উজ্জ্বল, আনন্দময় চরিত্রের জন্য পরিচিত এবং প্রায়শই উৎসব ও লোকগাথায় ব্যবহৃত হয়?
'ইন স্কেল'-এর সবচেয়ে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য কোনটি যা একে বিষণ্ণ ও রহস্যময় করে তোলে?