No history yet

মৌর্য ইতিহাসের উৎসসমূহ

মৌর্য ইতিহাসের উৎস

মৌর্য যুগ সম্পর্কে জানতে আমাদের সাহিত্যিক এবং প্রত্নতাত্ত্বিক—উভয় ধরনের উৎসের উপর নির্ভর করতে হয়। এই উৎসগুলো কেবল তথ্যের ভান্ডার নয়, বরং একে অপরের বক্তব্যের সত্যতা যাচাই করতেও সাহায্য করে। তবে প্রতিটি উৎসের নিজস্ব সীমাবদ্ধতা রয়েছে, যা একজন পরীক্ষার্থীর পক্ষে বোঝা অত্যন্ত জরুরি।

কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র: রাষ্ট্রশাসনের দলিল

চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের প্রধানমন্ত্রী কৌটিল্য (বা চাণক্য) রচিত অর্থশাস্ত্র গ্রন্থটি মৌর্য প্রশাসন, অর্থনীতি এবং আইন ব্যবস্থার একটি বিস্তারিত চিত্র তুলে ধরে। এটি সরাসরি ইতিহাস গ্রন্থ না হলেও, তৎকালীন রাষ্ট্র পরিচালনার নীতি সম্পর্কে জানার জন্য এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উৎস। ১৯০৫ সালে আর. শামাশাস্ত্রী এই গ্রন্থটি আবিষ্কার করেন, যা মৌর্য ইতিহাস গবেষণায় এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে।

সম্পূর্ণ গ্রন্থটি ১৫টি 'অধিকরণ' বা পর্বে বিভক্ত, যা রাষ্ট্র পরিচালনার বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করে। প্রতিটি অধিকরণ নির্দিষ্ট বিষয়ের উপর আলোকপাত করে, যা থেকে মৌর্য রাষ্ট্র ব্যবস্থার একটি সামগ্রিক ধারণা পাওয়া যায়।

অধিকরণবিষয়বস্তু
প্রথমরাজার আচরণ ও কর্তব্য
দ্বিতীয়সরকারি বিভাগের অধ্যক্ষদের কার্যবলী
তৃতীয়দেওয়ানি আইন (Civil Law)
চতুর্থফৌজদারি আইন (Criminal Law)
পঞ্চমরাজকর্মচারীদের আচরণবিধি
ষষ্ঠরাষ্ট্রের সপ্তাঙ্গ তত্ত্ব (রাজা, অমাত্য, জনপদ, দুর্গ, কোষ, দণ্ড, মিত্র)
সপ্তমবৈদেশিক নীতি ও ষড়গুণ নীতি
অষ্টমরাষ্ট্রের বিপদ ও তার প্রতিকার
নবমআক্রমণের প্রস্তুতি
দশমযুদ্ধনীতি
একাদশসংঘ বা গোষ্ঠীর মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির কৌশল
দ্বাদশশক্তিশালী শত্রুর মোকাবিলা করার উপায়
ত্রয়োদশদুর্গ দখলের কৌশল
চতুর্দশগুপ্তবিদ্যা ও অলৌকিক উপায়
পঞ্চদশগ্রন্থের পরিকল্পনা ও পদ্ধতি

মেগাস্থিনিসের ইন্ডিকা: একজন বিদেশীর চোখে

সেলুকিড রাষ্ট্রদূত মেগাস্থিনিস চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের দরবারে বেশ কিছুকাল অবস্থান করেন এবং তাঁর অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে 'ইন্ডিকা' গ্রন্থটি রচনা করেন। দুর্ভাগ্যবশত, মূল গ্রন্থটি হারিয়ে গেছে। আমরা পরবর্তী গ্রিক ও রোমান লেখকদের (যেমন—স্ট্র্যাবো, আরিয়ান, প্লিনি) রচনার উদ্ধৃতি থেকে এর খণ্ডিত অংশ পাই।

ইন্ডিকা মৌর্য ভারতের সামাজিক শ্রেণীবিভাগ, পাটলিপুত্রের নগর প্রশাসন এবং সামরিক ব্যবস্থা সম্পর্কে মূল্যবান তথ্য দেয়। তবে মেগাস্থিনিসের কিছু পর্যবেক্ষণ ভুল বা অতিরঞ্জিত ছিল। উদাহরণস্বরূপ, তিনি ভারতীয় সমাজে সাতটি শ্রেণীর কথা বলেছেন, যা চতুর্বর্ণ প্রথার সাথে মেলে না। এছাড়াও, তিনি ভারতে দাসপ্রথা ও মহাজনী প্রথার অনুপস্থিতির কথা বলেছিলেন, যা সঠিক নয়। এই ভুল ধারণাগুলো সম্ভবত ভারতীয় সমাজের জটিলতা সম্পর্কে তাঁর সীমাবদ্ধ জ্ঞানের পরিচায়ক।

মেগাস্থিনিসের ভুল ধারণা সত্ত্বেও, তাঁর লেখা পাটলিপুত্র নগরীর পৌর প্রশাসনের বর্ণনা (যাতে ৩০ জন সদস্যের ৬টি সমিতির উল্লেখ আছে) আজও ঐতিহাসিকদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

অশোকের শিলালিপি: পাথরের বুকে খোদাই ইতিহাস

Lesson image

মৌর্য ইতিহাসের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য প্রত্নতাত্ত্বিক উৎস হলো সম্রাট অশোকের শিলালিপি। জেমস প্রিন্সেপ ১৮৩৭ সালে এই লিপিগুলির পাঠোদ্ধার করেন। এই লিপিগুলো সাম্রাজ্যের প্রশাসনিক আদর্শ, ধর্মীয় নীতি (ধর্ম) এবং বৈদেশিক সম্পর্ক বোঝার জন্য অপরিহার্য।

অশোকের লিপিগুলিকে মূলত তিনটি প্রধান ভাগে ভাগ করা হয়:

১. মুখ্য শিলালিপি (Major Rock Edicts): মোট ১৪টি অনুশাসন, যা সাম্রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে পাওয়া গেছে। এগুলিতে মূলত ধর্মীয় সহিষ্ণুতা, অহিংসা এবং প্রশাসনিক সংস্কারের কথা বলা হয়েছে।

২. ক্ষুদ্র শিলালিপি (Minor Rock Edicts): এগুলিতে অশোকের ব্যক্তিগত বিশ্বাস এবং বৌদ্ধধর্মের প্রতি তাঁর অনুরাগের কথা জানা যায়।

৩. স্তম্ভলিপি (Pillar Edicts): এগুলি পালিশ করা পাথরের স্তম্ভের উপর খোদাই করা হয়েছে এবং মূলত সাম্রাজ্যের কেন্দ্রীয় অংশে পাওয়া যায়। এতে ধর্মের নীতি এবং প্রশাসনিক নির্দেশাবলী রয়েছে।

এই শিলালিপিগুলির ভৌগোলিক অবস্থান ও ভাষার ব্যবহার অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। সাম্রাজ্যের অধিকাংশ লিপির ভাষা ছিল প্রাকৃত এবং লিপি ছিল ব্রাহ্মী। তবে উত্তর-পশ্চিম সীমান্তে, গ্রিক এবং আরামাইক ভাষা ও লিপির ব্যবহার দেখা যায়, যা ঐ অঞ্চলের মানুষের কাছে বোধগম্য ছিল।

বিভিন্ন ধরনের উৎস থেকে প্রাপ্ত তথ্যের মধ্যে তুলনা করলে কিছু বৈপরীত্য দেখা যায়। যেমন, পুরাণগুলি চন্দ্রগুপ্তকে শূদ্র বংশোদ্ভূত বলে উল্লেখ করেছে, যেখানে বৌদ্ধ ও জৈন গ্রন্থগুলি তাঁকে ক্ষত্রিয় বংশের বলে দাবি করে। এই বৈপরীত্যগুলি তৎকালীন রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটকে প্রতিফলিত করে।

পরবর্তীকালের উৎসও মৌর্য ইতিহাস পুনর্গঠনে সাহায্য করে। উদাহরণস্বরূপ, রুদ্রদমনের জুনাগড় শিলালিপি (আনুমানিক ১৫০ খ্রিস্টাব্দ) থেকে আমরা জানতে পারি যে চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের নির্দেশে সুদর্শন হ্রদ খনন করা হয়েছিল। বিশাখদত্তের নাটক 'মুদ্রারাক্ষস', যা সম্ভবত গুপ্ত যুগে রচিত হয়েছিল, চাণক্যের সাহায্যে চন্দ্রগুপ্তের ক্ষমতা দখলের কাহিনী বর্ণনা করে, যদিও এর ঐতিহাসিক সত্যতা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে।

Quiz Questions 1/4

কৌটিল্যের 'অর্থশাস্ত্র' গ্রন্থটি কে আবিষ্কার করেন?

Quiz Questions 2/4

মেগাস্থিনিসের 'ইন্ডিকা' অনুসারে, মৌর্য ভারতে কোন বিষয়টি সম্পর্কে তার পর্যবেক্ষণ সঠিক ছিল না?

সুতরাং, মৌর্য ইতিহাসের একটি নির্ভরযোগ্য চিত্র পেতে হলে কোনো একটি উৎসের উপর অন্ধভাবে নির্ভর না করে, বিভিন্ন উৎসের তুলনামূলক বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।