No history yet

চন্দ্রগুপ্ত ও মৌর্য সাম্রাজ্য

চন্দ্রগুপ্ত ও মৌর্য সাম্রাজ্যের সূচনা

মৌর্য সাম্রাজ্য ছিল ভারতের প্রথম বৃহৎ সাম্রাজ্য এবং এর প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য। তাঁর উত্থান শুধুমাত্র একজন শাসকের বিজয় নয়, বরং এটি ছিল একটি রাজনৈতিক বিপ্লব, যা এক নতুন যুগের সূচনা করে। এই বিশাল সাম্রাজ্য গঠনের পিছনে মূল চালিকাশক্তি ছিলেন তাঁর গুরু ও পরামর্শদাতা চাণক্য।

নন্দ বংশের পতন ও চাণক্যের ভূমিকা

চন্দ্রগুপ্তের উত্থানের আগে মগধ শাসন করত নন্দ বংশ। তাদের শেষ রাজা ধননন্দ ছিলেন অত্যন্ত শক্তিশালী কিন্তু অত্যাচারী ও অপ্রিয়। এই সময়ে, তক্ষশিলার একজন বিদ্বান ব্রাহ্মণ, , ধননন্দ দ্বারা অপমানিত হন। এই অপমানের প্রতিশোধ নিতে এবং একটি অখণ্ড ও শক্তিশালী ভারত গড়ার লক্ষ্যে তিনি প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হন।

চাণক্য একজন যোগ্য নেতার সন্ধানে বেরিয়ে পড়েন এবং বিন্ধ্য অঞ্চলের জঙ্গলে চন্দ্রগুপ্তকে খুঁজে পান। তিনি চন্দ্রগুপ্তের মধ্যে নেতৃত্বের সম্ভাবনা দেখতে পান এবং তাঁকে তক্ষশিলায় নিয়ে গিয়ে যুদ্ধবিদ্যা, রাজনীতি ও শাসন সংক্রান্ত শিক্ষা দেন। সঠিক প্রশিক্ষণ এবং চাণক্যের কৌশলের ওপর ভিত্তি করে, চন্দ্রগুপ্ত একটি শক্তিশালী সেনাবাহিনী তৈরি করেন এবং সরাসরি মগধের রাজধানী পাটলিপুত্র আক্রমণ করেন। এক ভয়াবহ যুদ্ধে তিনি ধননন্দকে পরাজিত ও হত্যা করে নন্দ বংশের শাসনের অবসান ঘটান এবং খ্রিস্টপূর্ব ৩২২ অব্দে মৌর্য সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠা করেন।

Lesson image

সেলুকাসের সাথে যুদ্ধ ও সন্ধি

আলেকজান্ডারের মৃত্যুর পর তাঁর সেনাপতিরা সাম্রাজ্য ভাগ করে নেন। পূর্ব দিকের বিশাল অংশ পান । তিনি আলেকজান্ডারের ভারতীয় অঞ্চল পুনরুদ্ধারের জন্য খ্রিস্টপূর্ব ৩০৫ অব্দে ভারত আক্রমণ করেন। সিন্ধু নদের তীরে চন্দ্রগুপ্তের বিশাল সেনাবাহিনীর মুখোমুখি হন তিনি।

যুদ্ধে সেলুকাস পরাজিত হন এবং একটি সম্মানজনক সন্ধি করতে বাধ্য হন। এই সন্ধির শর্তগুলো ছিল মৌর্য সাম্রাজ্যের জন্য অত্যন্ত লাভজনক:

  • সেলুকাস তাঁর সাম্রাজ্যের চারটি গুরুত্বপূর্ণ প্রদেশ—আরিয়া (হেরাট), আরাকোশিয়া (কান্দাহার), গেড্রোসিয়া (মাকরান) এবং পারোপামিসাদাই (কাবুল উপত্যকা)—চন্দ্রগুপ্তকে ছেড়ে দেন।
  • চন্দ্রগুপ্ত এর বিনিময়ে সেলুকাসকে ৫০০টি যুদ্ধহস্তী উপহার দেন, যা তাঁর পশ্চিমা শত্রুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে খুব কার্যকরী হয়েছিল।
  • উভয়ের মধ্যে একটি বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপিত হয়। অনেক ঐতিহাসিকের মতে, চন্দ্রগুপ্ত সেলুকাসের কন্যাকে বিবাহ করেন।
  • সেলুকাস তাঁর দূত হিসেবে মেগাস্থিনিসকে পাটলিপুত্রে চন্দ্রগুপ্তের রাজসভায় পাঠান। মেগাস্থিনিসের লেখা 'ইন্ডিকা' গ্রন্থটি মৌর্য যুগ সম্পর্কে জানার একটি অমূল্য উৎস।

চন্দ্রগুপ্তের সাম্রাজ্যের বিস্তার

চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য শুধুমাত্র নন্দদের ক্ষমতাচ্যুত করেই থেমে থাকেননি, তিনি প্রায় সমগ্র ভারতীয় উপমহাদেশকে এক শাসনের অধীনে এনেছিলেন। তাঁর সাম্রাজ্য উত্তরে হিমালয় থেকে দক্ষিণে কর্ণাটকের শ্রাবণবেলগোলা পর্যন্ত এবং পূর্বে বঙ্গদেশ থেকে পশ্চিমে হিন্দুকুশ পর্বতমালা পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। এটি ছিল ভারতের ইতিহাসে প্রথম কোনো সাম্রাজ্য যা এতটা বিশাল ভৌগোলিক এলাকা জুড়ে বিস্তৃত হয়েছিল। তাঁর সুদক্ষ শাসন এবং শক্তিশালী সামরিক বাহিনী এই বিশাল সাম্রাজ্যকে স্থিতিশীল রেখেছিল।

জৈন ধর্ম গ্রহণ ও শেষ জীবন

জীবনের শেষ দিকে, চন্দ্রগুপ্ত সিংহাসন ত্যাগ করে আধ্যাত্মিক পথের দিকে ঝুঁকে পড়েন। তিনি জৈন আচার্য -এর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন এবং জৈন ধর্মে দীক্ষিত হন। তিনি তাঁর পুত্র বিন্দুসারের হাতে সাম্রাজ্যের ভার তুলে দেন।

ধর্মীয় গুরুর সাথে তিনি দাক্ষিণাত্যে যাত্রা করেন এবং কর্ণাটকের শ্রাবণবেলগোলায় বাকি জীবন কাটান। সেখানেই তিনি জৈন প্রথা অনুসারে স্বেচ্ছায় অনশনের মাধ্যমে (সল্লেখনা) দেহত্যাগ করেন। একজন পরাক্রমী সম্রাট থেকে আধ্যাত্মিক সাধকে তাঁর এই রূপান্তর ইতিহাসে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।

এখন আপনার জ্ঞান পরীক্ষা করার সময়।

Quiz Questions 1/6

মৌর্য সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা কে ছিলেন?

Quiz Questions 2/6

চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের উত্থানের পিছনে মূল চালিকাশক্তি এবং তাঁর গুরু কে ছিলেন?

চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য কেবল একজন বিজেতা ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন দূরদর্শী শাসক যিনি ভারতের প্রথম ঐক্যবদ্ধ সাম্রাজ্যের ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন। তাঁর জীবনযাত্রা একজন সাধারণ মানুষ থেকে সম্রাট এবং অবশেষে আধ্যাত্মিক সাধকে পরিণত হওয়ার এক অসাধারণ কাহিনী।