No history yet

বর্ণমালার সঠিক উচ্চারণ

বর্ণমালার শুদ্ধ উচ্চারণ

শিশুদের বাংলা ভাষা শেখানোর প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো বর্ণমালার প্রতিটি বর্ণের সঠিক ও স্পষ্ট উচ্চারণ শেখানো। একটি মজবুত ভিত্তি ছাড়া যেমন একটি বড় দালান তৈরি করা যায় না, ঠিক তেমনি শুদ্ধ উচ্চারণ ছাড়া ভাষাগত দক্ষতা অর্জন করা কঠিন। প্রতিটি ধ্বনি জিহ্বা, ঠোঁট এবং মুখের কোন অংশ থেকে আসছে, তা শিশুদের সহজ করে বোঝাতে পারলে তারা শুরু থেকেই আত্মবিশ্বাসের সাথে ভাষা শিখতে পারে।

স্বরবর্ণের সঠিক উচ্চারণ

বাংলা স্বরবর্ণগুলোর উচ্চারণ অনেক সময় সহজ মনে হলেও এর মধ্যে সূক্ষ্ম পার্থক্য রয়েছে। যেমন, 'অ' এবং 'আ' এর মধ্যে পার্থক্য শুধু মুখ খোলার পরিমাণে। 'অ' উচ্চারণের সময় মুখ কম খোলা থাকে, আর 'আ' বলার সময় মুখ পুরোপুরি খুলতে হয়। একইভাবে, হ্রস্ব স্বর (ই, উ) এবং দীর্ঘ স্বর (ঈ, ঊ)-এর মধ্যে সময়ের পার্থক্য বোঝানো জরুরি। যদিও আধুনিক বাংলায় দীর্ঘ স্বরের ব্যবহার কমে এসেছে, তবে পড়ার সময় এর গুরুত্ব বোঝা যায়। প্রতিটি স্বরবর্ণের নিজস্ব একটি ধ্বনি আছে যা অন্য কোনোটির সাথে মেশানো উচিত নয়। এই মৌলিক জ্ঞান শিশুদের -এর প্রাথমিক ধারণার সাথে পরিচয় করিয়ে দেয় এবং তাদের শোনার দক্ষতা তীক্ষ্ণ করে তোলে।

বর্ণউচ্চারণ (IPA)মুখের ভঙ্গি
ɔঠোঁট গোল এবং মুখ সামান্য খোলা থাকবে।
aমুখ সম্পূর্ণভাবে খুলতে হবে, যেন ডাক্তার জিহ্বা দেখছেন।
iঠোঁট প্রসারিত থাকবে, অনেকটা হাসার মতো।
uঠোঁট ছুঁচালো করে সামনের দিকে এগিয়ে আনতে হবে।

ব্যঞ্জনবর্ণ: কণ্ঠ, তালু ও অন্যান্য

ব্যঞ্জনবর্ণগুলোকে তাদের উচ্চারণের স্থান অনুযায়ী কয়েকটি ভাগে ভাগ করা হয়। একে বলা হয় বর্গ। প্রতিটি বর্গের বর্ণগুলো মুখের একটি নির্দিষ্ট অংশ থেকে উচ্চারিত হয়। যেমন, 'ক' বর্গটি কণ্ঠ থেকে, 'চ' বর্গটি তালু থেকে, এবং 'প' বর্গটি দুটি ঠোঁটের স্পর্শে উচ্চারিত হয়। এই বিভাজন শিশুদের বুঝতে সাহায্য করে যে প্রতিটি শব্দ তৈরির পেছনে একটি নির্দিষ্ট কৌশল কাজ করে।

উচ্চারণের স্থান অনুযায়ী এই শ্রেণিবিভাগ জানা থাকলে শিশুরা বর্ণের সঠিক ধ্বনি সহজে আয়ত্ত করতে পারে। প্রতিটি বর্গের প্রথম এবং তৃতীয় বর্ণটি হলো অল্পপ্রাণ, অর্থাৎ এতে বাতাসের চাপ কম থাকে। অন্যদিকে, দ্বিতীয় এবং চতুর্থ বর্ণটি হলো । এইগুলোতে বাতাসের চাপ বেশি থাকে, যা উচ্চারণে একটি বাড়তি ঝোঁক তৈরি করে। যেমন, 'ক' বলার চেয়ে 'খ' বলার সময় মুখ থেকে বেশি বাতাস বের হয়।

বর্গবর্ণউচ্চারণের স্থান
ক-বর্গক, খ, গ, ঘ, ঙকণ্ঠ্য (গলার ভেতর থেকে)
চ-বর্গচ, ছ, জ, ঝ, ঞতালব্য (জিহ্বার মাঝখান ও তালু)
ট-বর্গট, ঠ, ড, ঢ, ণমূর্ধন্য (জিহ্বার আগা উল্টে তালুতে)
ত-বর্গত, থ, দ, ধ, নদন্ত্য (জিহ্বার আগা ও দাঁতের গোড়া)
প-বর্গপ, ফ, ব, ভ, মওষ্ঠ্য (দুই ঠোঁটের স্পর্শে)

যুক্তবর্ণের ভিত্তি ও অনুশীলন

যুক্তবর্ণের সঠিক উচ্চারণ নির্ভর করে প্রতিটি একক বর্ণের বিশুদ্ধ ধ্বনির ওপর। যদি একটি শিশু 'ক' এবং 'ষ'-এর সঠিক উচ্চারণ জানে, তবেই সে 'ক্ষ' (ক্ + ষ) সঠিকভাবে উচ্চারণ করতে পারবে। তাই যুক্তবর্ণ শেখানোর আগে নিশ্চিত করতে হবে যে প্রতিটি মৌলিক বর্ণের ধ্বনি তার কাছে পরিষ্কার। যুক্তবর্ণের জগৎ শিশুদের জন্য কিছুটা জটিল হতে পারে। তাই তাড়াহুড়ো না করে ধীরে ধীরে প্রতিটি যুক্তবর্ণ ভেঙে তার গঠন ও উচ্চারণ শেখানো উচিত।

অনুশীলনের জন্য অডিও-ভিজ্যুয়াল পদ্ধতি খুব কার্যকর। বর্ণ নিয়ে তৈরি ছড়া, গান বা অ্যানিমেশন ভিডিও শিশুদের মনোযোগ ধরে রাখে। শিক্ষক বা অভিভাবক যখন একটি বর্ণ উচ্চারণ করবেন, তখন শিশু তা শুনবে এবং দেখবে। এরপর সে নিজে অনুকরণ করার চেষ্টা করবে। এই দেখে ও শুনে শেখার পদ্ধতি শিশুদের মস্তিষ্কে প্রতিটি বর্ণের ধ্বনি ও আকৃতিকে স্থায়ীভাবে গেঁথে দিতে সাহায্য করে।

Lesson image

সবশেষে মনে রাখতে হবে, প্রতিটি শিশুই তার নিজস্ব গতিতে শেখে। তাই ধৈর্য ধরে, খেলার ছলে এবং উৎসাহ দিয়ে তাদের শেখালে তারা দ্রুতই বাংলা বর্ণমালার সঠিক উচ্চারণে পারদর্শী হয়ে উঠবে।