ভারতীয় ও চীনা শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের তুলনামূলক অধ্যয়ন
চীনা সঙ্গীত তত্ত্ব ও স্কেল
চীনা পঞ্চস্বরীয় স্কেলের গঠন
ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে, পঞ্চস্বরীয় বা ঔড়ব রাগের ধারণাটি আপনার কাছে পরিচিত, যেমন ভূপালী বা মালকোষ। চীনা শাস্ত্রীয় সঙ্গীতও একটি পঞ্চস্বরীয় কাঠামোর উপর ভিত্তি করে নির্মিত, যা 五声调式 (wǔ shēng diào shì) নামে পরিচিত। তবে এর প্রয়োগ এবং তাত্ত্বিক ভিত্তি ভারতীয় পদ্ধতি থেকে বেশ আলাদা। চীনা স্কেলের মূল ভিত্তি হলো পাঁচটি স্বর: গং (宫), শাং (商), জ্যাও (角), ঝি (徵), এবং য়ু (羽)।
五声调式 (wǔ shēng diào shì)
noun
চীনা সঙ্গীতের পঞ্চস্বরীয় স্কেল পদ্ধতি, যা পাঁচটি মূল স্বরের উপর ভিত্তি করে গঠিত।
এই পাঁচটি স্বরকে ভারতীয় স্বর সপ্তকের সা, রে, গা, পা, ধা-এর সাথে তুলনা করা যেতে পারে। এদের মধ্যে ব্যবধানগুলি পশ্চিমা স্কেলের Major 2nd, Major 2nd, Minor 3rd, Major 2nd এর মতো। অর্থাৎ, যদি আমরা গং-কে C হিসাবে ধরি, তাহলে স্বরগুলি হবে C (গং), D (শাং), E (জ্যাও), G (ঝি), এবং A (য়ু)। এখানে মধ্যম (ম) এবং নিষাদ (নি) অনুপস্থিত, যা ভারতীয় ঔড়ব রাগের গঠনের মতোই। কিন্তু চীনা সঙ্গীতে এই স্বরগুলির কেবল শ্রুতিমধুর তাৎপর্য নেই, তাদের গভীর দার্শনিক এবং মহাজাগতিক তাৎপর্যও রয়েছে।
মোড বা 调式 (diàoshì)
চীনা সঙ্গীত পদ্ধতির সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো এর মোডাল সিস্টেম, যা 调式 (diàoshì) নামে পরিচিত। ভারতীয় সঙ্গীতের মূর্ছনা পদ্ধতির সাথে এর ধারণাগত মিল রয়েছে। একটি পঞ্চস্বরীয় স্কেলের পাঁচটি স্বরের যেকোনো একটিকে টনিক বা মূল স্বর হিসাবে ব্যবহার করে একটি নতুন মোড তৈরি করা হয়। প্রতিটি মোডের নিজস্ব চরিত্র, অনুভূতি এবং প্রয়োগ রয়েছে।
যখন 'গং' টনিক হয়, তখন তাকে বলা হয় গং মোড (宫调)। একইভাবে, 'শাং' টনিক হলে শাং মোড (商调) তৈরি হয়। এইভাবে পাঁচটি মূল স্বর থেকে পাঁচটি ভিন্ন মোড তৈরি হয়, যা একই স্বরগুচ্ছ ব্যবহার করেও সম্পূর্ণ ভিন্ন সাংগীতিক মেজাজ তৈরি করে।
| মোডের নাম (调式) | টনিক স্বর | আপেক্ষিক স্বরবিন্যাস (গং = ১) | অনুভূতি/চরিত্র |
|---|---|---|---|
| গং (宫) | গং (宫) | ১, ২, ৩, ৫, ৬ | মহিমান্বিত, স্থিতিশীল |
| শাং (商) | শাং (商) | ১, ২, ৪, ৫, ৭♭ | বিষণ্ণ, করুণ |
| জ্যাও (角) | জ্যাও (角) | ১, ৩♭, ৪, ৬♭, ৭♭ | প্রাণবন্ত, সজীব |
| ঝি (徵) | ঝি (徵) | ১, ২, ৪, ৫, ৬ | উজ্জ্বল, আনন্দময় |
| য়ু (羽) | য়ু (羽) | ১, ৩♭, ৪, ৫, ৭♭ | শান্ত, নির্মল |
উপরের সারণীতে আপেক্ষিক স্বরবিন্যাসটি লক্ষ্য করলে বোঝা যায়, প্রতিটি মোডে স্বরগুলির মধ্যেকার ব্যবধান পরিবর্তিত হচ্ছে, যা ভারতীয় থাট পরিবর্তনের মতোই নতুন সাংগীতিক পরিবেশ তৈরি করছে। যেমন, শাং মোডের কাঠামোটি মাইনর স্কেলের মতো অনুভূতি দেয়, যেখানে ঝি মোডটি মেজর স্কেলের মতো উজ্জ্বল। এই পদ্ধতিটি সুরকারকে একই পাঁচটি স্বর ব্যবহার করে বিভিন্ন আবেগ প্রকাশ করার সুযোগ দেয়, যা রাগের ভাব প্রকাশের ধারণার সাথে তুলনীয়।
ভারতীয় থাট বনাম চীনা মোড
ভারতীয় থাট এবং চীনা মোড—উভয়ই স্কেলের গঠনকাঠামো নির্ধারণ করে, কিন্তু তাদের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে।
১. স্বর সংখ্যা: ভারতীয় থাট সর্বদা সপ্তস্বরীয় বা হেপ্টাটোনিক হয়, যা ৭টি শুদ্ধ এবং ৫টি বিকৃত স্বর থেকে তৈরি হয়। অন্যদিকে, চীনা সঙ্গীতের মূল ভিত্তি পঞ্চস্বরীয়, যদিও এতে নামক দুটি অতিরিক্ত স্বর যোগ করে সপ্তস্বরীয় স্কেলও (七声调式) তৈরি করা হয়। এই অতিরিক্ত স্বর দুটি হলো বিয়ানঝি (变徵, ঝি-এর পরিবর্তিত রূপ) এবং বিয়ানগং (变宫, গং-এর পরিবর্তিত রূপ)।
২. উৎপত্তি: ভারতীয় থাটগুলি মেলকর্তা সিস্টেম থেকে উদ্ভূত, যা একটি গাণিতিক কাঠামোর উপর ভিত্তি করে ৭২টি সম্ভাব্য স্কেল তৈরি করে। এর বিপরীতে, চীনা মোডগুলি একটি একক পঞ্চস্বরীয় স্কেল থেকে টনিক পরিবর্তন (modal shift) করে তৈরি হয়। এর ভিত্তি গাণিতিক সম্ভাবনার চেয়ে বেশি দার্শনিক।
৩. প্রয়োগ: ভারতীয় সঙ্গীতে, একটি রাগ একটি নির্দিষ্ট থাটের অন্তর্গত হলেও তার নিজস্ব চলন, পকড় এবং আরোহ-অবরোহ থাকে। রাগ থাটের চেয়ে অনেক বেশি সুনির্দিষ্ট। চীনা সঙ্গীতে, একটি সুর নির্দিষ্ট মোডের উপর ভিত্তি করে তৈরি হয় এবং সেই মোডের চরিত্রকে অনুসরণ করে, কিন্তু রাগের মতো কঠোর আরোহ-অবরোহের নিয়ম সাধারণত থাকে না। এখানে মোডটিই সুরের মূল ভাব নির্ধারণ করে।
সহজ কথায়, ভারতীয় পদ্ধতিতে থাট হলো একটি অভিভাবক স্কেল, যার অধীনে নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে রাগ তৈরি হয়। চীনা পদ্ধতিতে, মোড নিজেই একটি সম্পূর্ণ সাংগীতিক মেজাজ, যা টনিক পরিবর্তনের মাধ্যমে উদ্ভূত হয়।
আপনার জ্ঞান পরীক্ষা করার জন্য এখানে কয়েকটি প্রশ্ন রয়েছে।
চীনা পঞ্চস্বরীয় স্কেলের পাঁচটি মূল স্বর কী কী?
ভারতীয় থাট এবং চীনা মোডের মধ্যে মূল পার্থক্য কী?
এই আলোচনা থেকে স্পষ্ট যে, চীনা এবং ভারতীয় সঙ্গীত পদ্ধতি উভয়ই স্কেল এবং মোডের উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠলেও তাদের প্রয়োগ, দর্শন এবং গঠন কাঠামোতে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে। এই ভিত্তিগত ধারণাগুলি চীনা সঙ্গীতের গভীরে প্রবেশ করতে সহায়ক হবে।