No history yet

জাপানি সঙ্গীতের পরিচিতি

জাপানি সঙ্গীতের জগৎ

ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে আপনার জ্ঞান জাপানি সঙ্গীতের কাঠামো এবং গভীরতা বোঝার জন্য একটি চমৎকার ভিত্তি। ভারতীয় সঙ্গীতের মতো জাপানি সঙ্গীতের ঐতিহ্যও হাজার হাজার বছরের পুরনো, যা ধর্ম, রাজদরবার এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তবে এর সুর, তাল এবং পরিবেশনের ভঙ্গি সম্পূর্ণ ভিন্ন এক নান্দনিক জগতের দরজা খুলে দেয়।

জাপানি সঙ্গীতকে মূলত তিনটি প্রধান ঐতিহাসিক পর্বে ভাগ করা যায়: প্রাচীন, মধ্যযুগীয় এবং এডো যুগ। প্রতিটি পর্বের নিজস্ব সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট ছিল, যা সঙ্গীতের রূপ এবং উদ্দেশ্যকে প্রভাবিত করেছে।

ঐতিহাসিক বিবর্তন

প্রাচীন যুগে (৭৯৪ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত) জাপানি সঙ্গীত মূলত চীন এবং কোরিয়ার মতো এশীয় মহাদেশের অন্যান্য দেশের দ্বারা প্রভাবিত ছিল। এই সময়েই জাপানের প্রাচীনতম দরবারী সঙ্গীত গাগাকু-এর জন্ম হয়, যা শিন্তো ধর্মের বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত ছিল। এটি অনেকটা ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের প্রাথমিক রূপের মতো, যা মূলত ধর্মীয় স্তোত্র এবং আচার-অনুষ্ঠানের প্রয়োজনে তৈরি হয়েছিল।

মধ্যযুগে (৭৯৪-১৬০৩) জাপানে সামুরাই শ্রেণীর উত্থান ঘটে। এই সময়ে বৌদ্ধধর্মের প্রসার ঘটে এবং এর সঙ্গে যুক্ত হয় এক ধরনের সঙ্গীত, যা 'শোমিয়ো' (বৌদ্ধ স্তোত্র) নামে পরিচিত। এই সময়কালেই নো (Noh) থিয়েটারের উদ্ভব হয়, যার সঙ্গীত ছিল অত্যন্ত প্রতীকী এবং আধ্যাত্মিক।

১৬০৩ থেকে ১৮৬৮ সাল পর্যন্ত স্থায়ী জাপানের ইতিহাসে এক স্বর্ণযুগ। এই সময়ে সাধারণ মানুষের জন্য শিল্প ও সংস্কৃতির বিকাশ ঘটে। কাবুকি (Kabuki) থিয়েটার এবং মিন'য়ো (Min'yō) বা লোকসঙ্গীতের জনপ্রিয়তা বাড়ে। ভারতীয় সঙ্গীতের ইতিহাসে যেমন ভক্তি আন্দোলন সাধারণ মানুষের মধ্যে সঙ্গীতের প্রসার ঘটিয়েছিল, এডো যুগে জাপানেও তেমনই একটি সাংস্কৃতিক বিপ্লব ঘটেছিল, যা সঙ্গীতকে অভিজাত শ্রেণীর বাইরে নিয়ে আসে।

সঙ্গীতের প্রধান প্রকারভেদ

জাপানি ঐতিহ্যবাহী সঙ্গীতের চারটি প্রধান ধারা রয়েছে, যার প্রত্যেকটির নিজস্ব বৈশিষ্ট্য এবং উদ্দেশ্য আছে।

গাগাকু (雅楽) - দরবারী সঙ্গীত

এটি জাপানের সবচেয়ে প্রাচীন এবং আনুষ্ঠানিক সঙ্গীত। গাগাকু মূলত রাজদরবারে এবং শিন্তো মন্দিরের অনুষ্ঠানে পরিবেশন করা হতো। এর সুরের গঠন জটিল এবং যন্ত্রের ব্যবহার অত্যন্ত নিয়ন্ত্রিত। ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের ধ্রুপদী ধারার মতো, গাগাকুর পরিবেশনাও অত্যন্ত গম্ভীর এবং আধ্যাত্মিক ভাব বজায় রাখে।

নো (能) - থিয়েটারের সঙ্গীত

নো হলো এক ধরনের ধ্রুপদী জাপানি সঙ্গীত-নাটক যা মধ্যযুগ থেকে চলে আসছে। এর সঙ্গীত অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত এবং প্রতীকী। এখানে মূল জোর দেওয়া হয় गायকের (উতাই) উপর এবং তার সাথে থাকে বাঁশি (নোকান) ও তিন ধরনের ড্রামের (কোৎসুজুমি, ওৎসুজুমি, তাইকো) সঙ্গত। এর পরিবেশনা অনেকটা ধীর এবং এতে নীরবতার একটি বড় ভূমিকা রয়েছে, যা নাটকীয় উত্তেজনা তৈরি করে।

কাবুকি (歌舞伎) - নাটকীয় সঙ্গীত

কাবুকি হলো এডো যুগে বিকশিত এক জনপ্রিয় থিয়েটার। নো-এর তুলনায় কাবুকির সঙ্গীত অনেক বেশি নাটকীয়, প্রাণবন্ত এবং বিনোদনমূলক। এখানে সঙ্গীতের উদ্দেশ্য হলো মঞ্চের ঘটনাকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলা এবং দর্শকদের আবেগ জাগানো। এতে বিভিন্ন ধরনের বাদ্যযন্ত্র এবং গানের শৈলী ব্যবহার করা হয়।

মিন'য়ো (民謡) - লোকসঙ্গীত

মিন'য়ো হলো জাপানের বিভিন্ন অঞ্চলের লোকসঙ্গীত। এই গানগুলো মূলত সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন, কাজ, উৎসব এবং প্রেম-বিরহের কথা বলে। ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের লোকসঙ্গীতের মতো, মিন'য়োর মধ্যেও প্রচুর বৈচিত্র্য দেখা যায়। হোক্কাইডোর জেলেদের গান থেকে শুরু করে ওকিনাওয়ার উৎসবের গান পর্যন্ত এর পরিধি বিস্তৃত।

ধর্ম ও সংস্কৃতির প্রভাব

ভারতীয় সঙ্গীতের মতোই, জাপানি সঙ্গীতের গভীরে ধর্মীয় প্রভাব অত্যন্ত স্পষ্ট। শিন্তো ধর্ম জাপানের নিজস্ব এবং প্রাচীনতম ধর্ম। শিন্তো মন্দিরের উৎসবগুলিতে (মাৎসুরি) পরিবেশিত সঙ্গীত 'কাগুরা' নামে পরিচিত, যা দেবতাদের मनोरञ्জনের জন্য নিবেদিত।

অন্যদিকে, বৌদ্ধধর্ম জাপানকে 'শোমিয়ো' বা বৌদ্ধ স্তোত্র উপহার দিয়েছে। এই স্তোত্র পাঠের শৈলী জাপানের কণ্ঠসঙ্গীতের উপর গভীর প্রভাব ফেলেছে। এই ধর্মীয় ভিত্তি সঙ্গীতের আধ্যাত্মিকতাকে সমৃদ্ধ করেছে, যা ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের রাগের আধ্যাত্মিকতার সাথে তুলনীয়, যদিও তাদের প্রকাশভঙ্গি সম্পূর্ণ ভিন্ন।

এই প্রাথমিক পরিচয়ের মাধ্যমে আমরা জাপানি সঙ্গীতের বিশাল জগতের একটি ঝলক পেলাম। পরবর্তী পাঠে আমরা এর বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র এবং সুরের গঠন নিয়ে আরও গভীরে যাব।