পৃথিবীর ঘূর্ণন ও মহাজাগতিক গতিপথ
ঘূর্ণনের উৎস ও মহাকর্ষ
ঘূর্ণনের সূচনা
পৃথিবীর ঘূর্ণন কোনো ইঞ্জিন বা শক্তির উৎস দ্বারা চালিত হয় না। বরং এর উৎস হলো সৌরজগত গঠনের একদম শুরুর মুহূর্তে। প্রায় ৪.৬ বিলিয়ন বছর আগে আমাদের সৌরজগত ছিল গ্যাস ও ধূলিকণার এক বিশাল ঘূর্ণায়মান মেঘ, যা সৌর নীহারিকা (solar nebula) নামে পরিচিত। এই মেঘ মহাকর্ষের প্রভাবে সংকুচিত হতে শুরু করে এবং এর কেন্দ্রে সূর্য গঠিত হয়।
এই সংকোচন প্রক্রিয়ার সময়, মেঘের ঘূর্ণন গতি আরও বাড়তে থাকে। ঠিক যেমন একজন স্কেটার ঘোরার সময় হাত গুটিয়ে নিলে তার ঘূর্ণন গতি বেড়ে যায়, তেমনই নীহারিকার সংকুচনের সাথে সাথে এর ঘূর্ণনও দ্রুততর হয়। এই ঘূর্ণন গতি থেকেই планеট, গ্রহাণু এবং অন্যান্য বস্তুর সৃষ্টি হয়, যারা সবাই একই দিকে ঘুরতে থাকে। পৃথিবীও এই আদি ঘূর্ণন থেকে তার কৌণিক ভরবেগ লাভ করে।
কৌণিক ভরবেগ (Angular Momentum) হলো কোনো ঘূর্ণায়মান বস্তুর ঘূর্ণন বজায় রাখার প্রবণতা। যেহেতু মহাশূন্য প্রায় পুরোপুরি শূন্য, তাই পৃথিবীকে থামানোর জন্য কোনো উল্লেখযোগ্য ঘর্ষণ বা বাধা নেই। ফলে, কোটি কোটি বছর আগে লাভ করা সেই কৌণিক ভরবেগের কারণেই পৃথিবী আজও নিজের অক্ষের ওপর ক্রমাগত ঘুরে চলেছে। এই ঘটনাটি পদার্থবিজ্ঞানের ভরবেগের সংরক্ষণ সূত্রের একটি চমৎকার উদাহরণ।
মহাকর্ষের অদৃশ্য বাঁধন
পৃথিবীর নিজের অক্ষের ওপর ঘোরাকে আহ্নিক গতি বলা হয়, যা দিন ও রাত ঘটায়। কিন্তু পৃথিবী সূর্যের চারপাশেও একটি নির্দিষ্ট পথে ঘুরছে, যাকে বার্ষিক গতি বলা হয়। এই বার্ষিক গতির কারণ হলো সূর্য এবং পৃথিবীর মধ্যে ক্রিয়াশীল মহাকর্ষ বল।
স্যার আইজ্যাক নিউটনের মহাকর্ষ সূত্র আমাদের এই বলের পরিমাণ বুঝতে সাহায্য করে। সূত্রটি বলে যে মহাবিশ্বের প্রতিটি বস্তু একে অপরকে আকর্ষণ করে এবং এই আকর্ষণ বল বস্তুদ্বয়ের ভরের গুণফলের সমানুপাতিক এবং তাদের মধ্যবর্তী দূরত্বের বর্গের ব্যস্তানুপাতিক।
সূর্যের বিশাল ভরের কারণে এটি পৃথিবীর ওপর একটি শক্তিশালী আকর্ষণ বল প্রয়োগ করে। এই বলই পৃথিবীকে তার কক্ষপথে ধরে রাখে এবং মহাশূন্যে ছিটকে যাওয়া থেকে বিরত রাখে। যদি সূর্যের এই আকর্ষণ না থাকত, তাহলে পৃথিবী তার সরলরৈখিক গতিপথ ধরে মহাশূন্যে হারিয়ে যেত।
বলের নিখুঁত ভারসাম্য
পৃথিবীর কক্ষপথ মূলত দুটি বলের ভারসাম্যের ফল। প্রথমটি হলো সূর্যের মহাকর্ষ বল, যা কেন্দ্রমুখী বল (Centripetal Force) হিসেবে কাজ করে এবং পৃথিবীকে ক্রমাগত ভেতরের দিকে, অর্থাৎ সূর্যের দিকে টানে।
দ্বিতীয় প্রভাবটি হলো পৃথিবীর নিজস্ব গতি। নিউটনের প্রথম সূত্র অনুযায়ী, যেকোনো বস্তু সরলরেখায় চলতে চায়। পৃথিবীর ক্ষেত্রেও তাই। সূর্যের চারপাশে ঘোরার সময় পৃথিবী প্রতি মুহূর্তে তার কক্ষপথ থেকে স্পর্শক বরাবর সরলরেখায় ছিটকে যেতে চায়। এই প্রবণতাকে কেন্দ্রবিমুখী বলের (Centrifugal Force) প্রভাব হিসেবে ভাবা যেতে পারে।
পৃথিবীর কক্ষপথে এই দুটি বল একে অপরকে নিখুঁতভাবে ভারসাম্য প্রদান করে। সূর্যের টান পৃথিবীকে ছিটকে যাওয়া থেকে রক্ষা করে, আর পৃথিবীর সরলরৈখিক গতি সূর্য কর্তৃক গ্রাস হওয়া থেকে বাঁচায়। এই সূক্ষ্ম ভারসাম্যের কারণেই পৃথিবী কোটি কোটি বছর ধরে তার স্থিতিশীল কক্ষপথে সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে চলেছে।
পৃথিবী কেন তার নিজের অক্ষের উপর বিলিয়ন বিলিয়ন বছর ধরে ঘুরছে?
কোন বৈজ্ঞানিক সূত্রটি সবচেয়ে ভালোভাবে ব্যাখ্যা করে যে কেন পৃথিবী মহাশূন্যে প্রায় কোনো বাধা ছাড়াই ঘুরতে পারে?
সুতরাং, পৃথিবীর ঘূর্ণন ও পরিক্রমণ কোনো রহস্যময় শক্তি দ্বারা চালিত নয়, বরং এটি পদার্থবিজ্ঞানের কিছু মৌলিক নীতির ফল, যা সৌরজগতের জন্মলগ্ন থেকে কার্যকর রয়েছে।