ভারতীয় ও কোরিয়ান শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের তুলনামূলক অন্বেষণ
কোরিয়ান সঙ্গীত পরিচয়
কোরিয়ান শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের পরিচয়
ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের কাঠামো যেমন হিন্দুস্তানি ও কর্ণাটকী—এই দুই প্রধান ধারায় বিভক্ত, কোরিয়ান শাস্ত্রীয় সঙ্গীত বা 'গুগাক' (Gugak)-এরও তেমনই তিনটি প্রধান ধারা রয়েছে। এই ধারাগুলি হলো দরবারী সঙ্গীত (Court Music), লোকসঙ্গীত (Folk Music), এবং আচার-অনুষ্ঠানের সঙ্গীত (Ritual Music)। প্রতিটি ধারার নিজস্ব নান্দনিকতা, পরিবেশন রীতি এবং সামাজিক প্রেক্ষাপট রয়েছে, যা ভারতীয় সঙ্গীতের ঘরানার ধারণার সাথে তুলনীয়।
কোরিয়ান সঙ্গীতের প্রধান ধারাগুলির মধ্যে প্রথমটি হলো 'আক' বা জেওংআক। এটি মূলত রাজদরবার এবং অভিজাত শ্রেণীর জন্য পরিবেশিত সঙ্গীত। এর প্রকৃতি অত্যন্ত ধীর, ধ্যানমগ্ন এবং আনুষ্ঠানিক। ভারতীয় সঙ্গীতের 'ধ্রুপদ' বা আলাপ অংশের বিলম্বিত লয়ের মতো, জেওংআক-এ প্রতিটি স্বরের প্রয়োগ ও তার অনুরণন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর উদ্দেশ্য বিনোদন নয়, বরং আত্ম-শুদ্ধি এবং মানসিক স্থিরতা অর্জন।
দ্বিতীয় ধারাটি হলো 'মিনসোকাক' বা লোকসঙ্গীত। এটি সাধারণ মানুষের জীবন, তাদের আনন্দ, বেদনা এবং শ্রমের সাথে জড়িত। ভারতীয় লোকসঙ্গীতের মতোই, মিনসোকাক অনেক বেশি আবেগপ্রবণ, ছন্দময় এবং প্রাণবন্ত। এর মধ্যে 'পানসোরি' (একক অপেরা) এবং 'সানজো' (বাদ্যযন্ত্রের একক পরিবেশনা)-এর মতো উন্নত রূপও রয়েছে, যা ভারতীয় ঠুমরি বা গজলের ভাবপ্রকাশের সাথে তুলনীয়।
তৃতীয় ধারা, 'উইলেআক', হলো আচার-অনুষ্ঠানের সঙ্গীত। এটি কনফুসীয় এবং বৌদ্ধ মন্দিরের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ব্যবহৃত হতো। এর পরিবেশনা অত্যন্ত আনুষ্ঠানিক এবং আধ্যাত্মিক ভাব দ্বারা পরিচালিত, যা অনেকটা বৈদিক মন্ত্র বা মন্দিরের স্তোত্রপাঠের কথা মনে করিয়ে দেয়।
নান্দনিকতা ও দার্শনিক ভিত্তি
ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের ভিত্তি যেমন রসতত্ত্ব এবং রাগ-কাঠামোর উপর নির্মিত, কোরিয়ান সঙ্গীতের নান্দনিকতাও কিছু মৌলিক ধারণার উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। এর মধ্যে দুটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হলো 'জেওংজুংডং' এবং 'হান'।
'জেওংজুংডং' (정중동) এর আক্ষরিক অর্থ হলো 'স্থিরতার মধ্যে গতি'। এই ধারণাটি কোরিয়ান শিল্পের প্রায় সমস্ত শাখায় প্রভাবশালী। সঙ্গীতের ক্ষেত্রে, এর অর্থ হলো একটি বাহ্যিকভাবে শান্ত ও ধীর গতির পরিবেশনার গভীরে এক প্রচণ্ড অন্তর্নিহিত শক্তি বা গতির প্রবাহ। ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের আলাপ বা বিস্তারের সময়, যেখানে শিল্পী একটি রাগের রূপকে ধীরে ধীরে উন্মোচন করেন, সেখানেও এই স্থিরতার মধ্যে গতির ধারণাটি খুঁজে পাওয়া যায়। প্রতিটি স্বর তার নিজস্ব মহিমায় প্রকাশিত হয়, কিন্তু সামগ্রিকভাবে একটি গতিময় সাঙ্গীতিক আখ্যান তৈরি হতে থাকে।
জেওংজুংডং: বাহ্যিক স্থিরতার আড়ালে থাকা এক গভীর ও অন্তর্নিহিত গতি।
অপরদিকে, (한) কোরিয়ান সংস্কৃতির এক অত্যন্ত জটিল ও গভীর আবেগ। একে কেবল 'দুঃখ' বা 'শোক' হিসেবে অনুবাদ করা যায় না। এটি আসলে এক সম্মিলিত ঐতিহাসিক বেদনা, অবিচারের বিরুদ্ধে চাপা ক্ষোভ এবং সেই পরিস্থিতিকে অতিক্রম করার এক স্থিতিস্থাপক আকাঙ্ক্ষার মিশ্রণ। ভারতীয় সঙ্গীতে যেমন 'করুণ রস' বা 'বীরহ'র ভাব রয়েছে, 'হান' তার থেকেও ব্যাপক। এটি একজন ব্যক্তির আবেগ না হয়ে একটি সমগ্র জাতির মানসিক অবস্থাকে প্রতিফলিত করে। পানসোরি বা সানজোর মতো সঙ্গীত ಪ್ರಕಾರগুলিতে এই 'হান'-এর প্রকাশ সবচেয়ে স্পষ্টভাবে দেখা যায়, যেখানে শিল্পী তার পরিবেশনার মাধ্যমে এই জটিল আবেগটিকে দর্শকের হৃদয়ে সঞ্চারিত করেন।
কাঠামোগত তুলনা
ভারতীয় সঙ্গীতের রাগ পদ্ধতি যেমন স্বর এবং আরোহ-অবরোহণের একটি নির্দিষ্ট কাঠামোর উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে, কোরিয়ান সঙ্গীতে তেমন কোনো নির্দিষ্ট 'রাগ' ব্যবস্থা নেই। তবে, তাদের নিজস্ব মেলোডিক মোড বা 'জো' (Jo) এবং রিদমিক সাইকেল বা 'জাংদান' (Jangdan) রয়েছে।
'জাংদান' ভারতীয় তালের মতোই একটি নির্দিষ্ট ছন্দের চক্র, যা সঙ্গীতের গতি এবং ভাব নির্ধারণ করে। বিভিন্ন 'জাংদান'-এর বিভিন্ন বোল বা প্যাটার্ন রয়েছে, যা সঙ্গীতের পরিবেশকে নিয়ন্ত্রণ করে। যদিও রাগের মতো জটিল মেলোডিক নিয়মাবলী কোরিয়ান সঙ্গীতে নেই, তবে 'জো' সিস্টেমটি একটি নির্দিষ্ট স্কেল বা স্বরের সেট ব্যবহার করে সঙ্গীতের মেজাজ বা ভাব তৈরি করে, যা কিছুটা হলেও ভারতীয় ঠাট বা মেলকর্তা পদ্ধতির সাথে তুলনীয়।
এই প্রাথমিক আলোচনার মাধ্যমে, ভারতীয় ও কোরিয়ান শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের কিছু মৌলিক মিল ও অমিল স্পষ্ট হয়। উভয় ঐতিহ্যই গভীর দার্শনিক ভিত্তি এবং নান্দনিক মূল্যের উপর প্রতিষ্ঠিত, যা কেবল বিনোদনের ঊর্ধ্বে গিয়ে এক আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা প্রদান করে।
কোরিয়ান শাস্ত্রীয় সঙ্গীত বা 'গুগাক'-এর প্রধান তিনটি ধারা কী কী?
কোরিয়ান শিল্প ও সঙ্গীতে 'জেওংজুংডং' (정중동) ধারণাটির অর্থ কী?
পরবর্তী পাঠে আমরা এই ধারণাগুলির গভীরে প্রবেশ করব।
