No history yet

কোরিয়ান লোকসংগীতের ভিত্তি

কোরিয়ান লোকসংগীতের ঐতিহাসিক উৎস

কোরিয়ান লোকসংগীত, যা (민요) নামে পরিচিত, এর শেকড় প্রাচীন কোরিয়ার কৃষিভিত্তিক সমাজ এবং শামানিস্টিক আচার-অনুষ্ঠানের গভীরে প্রোথিত। ভারতীয় লোকসংগীতের মতোই, এই সংগীতের জন্ম কোনো রাজদরবারে বা অভিজাত মহলে হয়নি, বরং এর উদ্ভব হয়েছে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা থেকে। ধান রোপণ, ফসল কাটা বা মাছ ধরার মতো কায়িক শ্রমের সময় ক্লান্তি দূর করতে এবং কাজের তালে ছন্দ আনতে গানের ব্যবহার ছিল অপরিহার্য। এই গানগুলো ছিল সম্মিলিত অভিজ্ঞতার প্রকাশ।

শামানিস্টিক বিশ্বাস কোরিয়ান লোকসংগীতের বিকাশে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। প্রকৃতির শক্তিকে আরাধনা, পূর্বপুরুষদের প্রতি শ্রদ্ধা এবং অশুভ শক্তিকে দূর করার জন্য বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠানে সংগীত এবং নৃত্য ব্যবহার করা হতো। এই গানগুলি শুধুমাত্র বিনোদনের মাধ্যম ছিল না, বরং এগুলি ছিল সামাজিক এবং আধ্যাত্মিক জীবনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ, যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মৌখিকভাবে প্রচলিত হয়ে এসেছে। এর গঠন ছিল সরল, এবং সুর ছিল পুনরাবৃত্তিমূলক, যা সাধারণ মানুষের পক্ষে মনে রাখা এবং গাওয়া সহজ ছিল।

রাজবংশের অধীনে বিবর্তন

কোরিয়ার বিভিন্ন রাজবংশের সময় লোকসংগীতের চরিত্র এবং ভূমিকা পরিবর্তিত হয়েছে। সিল্লা রাজবংশের (৫৭ খ্রিস্টপূর্ব - ৯৩৫ খ্রিস্টাব্দ) সময় 'হিয়াংগা' (향가) নামক এক ধরনের দেশীয় গানের বিকাশ ঘটে, যা লোকসংগীত এবং আনুষ্ঠানিক সংগীতের মধ্যে একটি সেতুবন্ধন তৈরি করে।

গোরিও রাজবংশের (৯১৮-১৩৯২) সময়, লোকসংগীত সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রচলিত থাকলেও, দরবারের সংগীত বা (정악)-এর প্রভাব বাড়তে থাকে। তবে, জোসেওন রাজবংশ (১৩৯২-১৯১০) ছিল লোকসংগীতের জন্য একটি નિર્ણায়ক সময়। এই সময়ে কনফুসীয় মতাদর্শ রাষ্ট্রীয় নীতিতে পরিণত হওয়ায় দরবারের সংগীত এবং সাধারণ মানুষের সংগীতের মধ্যে একটি সুস্পষ্ট বিভাজন তৈরি হয়। দরবারের সংগীত হয়ে ওঠে পরিমার্জিত এবং আনুষ্ঠানিক, যা 'সঠিক সংগীত' বা জেওংআক নামে পরিচিতি লাভ করে। এর বিপরীতে, লোকসংগীত বা 'সোগাক' (속악) অর্থাৎ 'সাধারণ সংগীত' মানুষের আবেগ এবং দৈনন্দিন জীবনের প্রতিচ্ছবি হিসেবে বিকশিত হতে থাকে।

এই বিভাজনের ফলেই (판소리)-এর মতো অনন্য সাংগীতিক ধারার জন্ম হয়, যা ছিল একাধারে সংগীত, নাটক এবং লোককथा। এটি ছিল সাধারণ মানুষের বিনোদনের একটি প্রধান মাধ্যম এবং সামাজিক সমালোচনার একটি শক্তিশালী হাতিয়ার।

Lesson image

ভারতীয় প্রেক্ষাপটে তুলনামূলক বিশ্লেষণ

কোরিয়ান এবং ভারতীয় লোকসংগীতের ঐতিহাসিক যাত্রাপথে বেশ কিছু সাদৃশ্য এবং বৈসাদৃশ্য লক্ষ্য করা যায়। উভয় ঐতিহ্যই গ্রামীণ কৃষিভিত্তিক জীবন এবং ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান থেকে উদ্ভূত। ভারতে যেমন ভজন, কীর্তন বা বাউলের মতো আধ্যাত্মিক লোকসংগীত প্রচলিত, তেমনি কোরিয়ার শামানিস্টিক গানগুলিও একই ধরনের সামাজিক-আধ্যাত্মিক ভূমিকা পালন করত। উভয় ক্ষেত্রেই লোকসংগীত ছিল শাস্ত্রীয় বা দরবারী সংগীত থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং সাধারণ মানুষের কণ্ঠস্বর।

তবে মূল পার্থক্যটি নিহিত রয়েছে রাজনৈতিক এবং সামাজিক কাঠামোতে। ভারতের বিশাল ভৌগোলিক বিস্তার এবং অসংখ্য আঞ্চলিক রাজ্যের কারণে এখানে অত্যন্ত বৈচিত্র্যময় এবং স্বাধীন লোকসংগীতের ধারা গড়ে উঠেছে। প্রতিটি অঞ্চলের নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি এবং ইতিহাস তার লোকসংগীতকে প্রভাবিত করেছে।

অন্যদিকে, কোরিয়ার তুলনামূলকভাবে কেন্দ্রীভূত রাজতান্ত্রিক শাসন (বিশেষত জোসেওন যুগে) দরবারী সংগীত (জেওংআক) এবং লোকসংগীতের (মিনইও) মধ্যে একটি তীক্ষ্ণ বিভেদ তৈরি করে। জাপানি ঔপনিবেশিক আমলে (১৯১০-১৯৪৫) কোরিয়ান লোকসংগীত জাতীয় পরিচয় এবং প্রতিরোধের প্রতীক হয়ে ওঠে। এই গানগুলি কোরিয়ান ভাষা ও সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখার একটি শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে কাজ করে, যা ব্রিটিশ শাসনামলে ভারতীয় লোকসংগীতের ভূমিকার সাথে তুলনীয়, যদিও এর তীব্রতা এবং প্রেক্ষাপট ভিন্ন ছিল।

Quiz Questions 1/5

কোরিয়ান লোকসংগীতের উৎপত্তি মূলত কোথা থেকে?

Quiz Questions 2/5

'জেওংআক' (정악) বলতে কী বোঝানো হয়?

এই আলোচনা কোরিয়ান লোকসংগীতের ঐতিহাসিক ভিত্তি এবং এর সামাজিক-সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট সম্পর্কে একটি ধারণা দেয়। ভারতীয় লোকসংগীতের সাথে এর সাদৃশ্য এবং বৈসাদৃশ্যগুলি বোঝা উভয় সংস্কৃতির সাংগীতিক ঐতিহ্যকে আরও গভীরভাবে উপলব্ধি করতে সাহায্য করে।